24/06/2025
গৃহ বনাম পাঠশালা
~~~~~~~~~~~
`````````````````````````
শিশুর শিক্ষা তার গৃহের নিভৃত কোণেই হওয়া উচিত, এই অভিমত এখন সেকেলে হয়ে গেছে, যদিও লক ও রুসোর চিন্তাতে গৃহকোণে শিক্ষার পক্ষে বলা হয়েছে। আলেকজান্ডার, হ্যানিবল এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের ক্ষেত্রে গৃহকোণে শিক্ষার নীতি অবলম্বন করা হয়েছিল। তবে এই পদ্ধতি অনুসরণ কেবলমাত্র ধনীদের পক্ষেই সম্ভব। আর শুধু এই কারণেই এ বিষয়ে অধিক আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু গৃহ ও স্কুলের মধ্যেকার দাবির অনুপাত এবং কোন বয়সে শিক্ষা শুরু হওয়া উচিত তা নিয়ে সংগত বিতর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে সুস্থ বাদানুবাদ চলতেও পারে।
ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্রের সরকারগুলোর অভিমত হল শ্রমজীবী শ্রেণীর সন্তানেরা ছয় বছর থেকে তেরো কিংবা চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত স্কুলে যাবে। অধিকতর সমর্থ শ্রমজীবী শ্রেণীর কয়েক শতাংশ ছেলেদের উৎসাহিত করা হয় উক্ত বয়স অতিক্রম করেও পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। ছাত্রবৃত্তির আকারে এই উৎসাহ প্রদান করা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে ধনী লোকের পুত্র-কন্যারা স্বাভাবিক নিয়মে চৌদ্দ বছরের পরও লেখাপড়া চালিয়ে যায়। কোন বয়স পর্যন্ত সর্বজনীন শিক্ষা বাঞ্ছনীয় এ ব্যাপারে কোনো সর্ববাদীসম্মত অভিমত নেই। এ বিষয়েও এক মত হতে পারা যায় নি যে সাধারণ স্কুল ভালো না বোর্ডিং স্কুল। তবে এ ব্যাপারে বোধ হয় দ্বিমত নেই যে 'সুগৃহ' নামক একটা কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে এবং 'সুগৃহ' যে কোনো বোর্ডিং স্কুলের চেয়ে উত্তম। তবে কতকগুলো গৃহ যে 'সুগৃহ' নয়, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ করা চলে না। প্রশ্নটা জটিল। কারণ এখানে উভয় পক্ষে কথা বলার সুযোগ রয়েছে। বাস্তবিক পক্ষে প্রশ্নটার দুটি দিক রয়েছে। কোন বয়সে স্কুল শুরু হবে বা হওয়া উচিত? সাধারণ স্কুল না বোর্ডিং স্কুল ভালো? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে এখন আলোচনা করব।
কোন বয়সে স্কুল শুরু হওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে গৃহের ওপর। গৃহও নয়, গৃহের ভূ-সংস্থানের ওপর। তবে কোনোমতেই নৈতিক কিংবা মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রের ওপর নয়। যে ছেলে গ্রামের খামারবাড়িতে থাকে সে তো মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারে, বনে-অরণ্যে ঘুরেফিরে পর্যবেক্ষণ করতে পারে জীব জানোয়ার, খামারে বসে দেখতে পারে খড় শুকানো, ধান কাটা, শস্য মাড়ানো, হাল ধরতে পারে, তার পর সময় হলে স্কুলে যাবে। শহরে ছেলেদের ব্যাপারটা আলাদা। তাদের পিতামাতারা অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষুদ্র পরিসরে বাস করে। এই ছেলেদের জন্য স্কুল খুবই জরুরি, স্কুলে গেলেই সে মুক্ত বোধ করবে। তাদের গতিবিধি হবে মুক্ত, হট্টগোলের স্বাধীনতা পাবে, আর পারবে স্বাধীনভাবে সঙ্গী বেছে নিতে।
এই ব্যাপারে আমি অনেক রোগতত্ত্ববিশারদের সঙ্গে কথা বলেছি, দেখেছি তারা নার্সারি স্কুলের ঘোরবিরোধী। তারা মনে করেন নার্সারি স্কুলগুলো ধরে নিয়েছে প্রতিটি স্কুলের পাঠ্যক্রম সুনিদিষ্ট হওয়া উচিত। আসলে নার্সারি স্কুলের উচিত এমন পাঠ্যক্রম রাখা যাতে ছেলেরা মজা বোধ করতে পারে। তাছাড়া তাদের সার্বক্ষণিক তদারকির ভেতর রাখা ঠিক হবে না। গৃহে তাদের কিন্তু তদারকির মধ্যেই থাকতে হয়। স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ মোটে মেলে না। শহরে ছেলেদের মধ্যে যাদের পিতামাতারা ধনাঢ্য নয়, তাদের কিছু বাস্তবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দাবি রয়েছে যা গৃহের নিভৃত কোণে মেটানো সম্ভব নয়। এই দাবিগুলোর প্রধান হল আলো ও বাতাস। মার্গারেট ম্যাকমিলান লক্ষ করেছেন তাঁর নার্সারি স্কুলে যারা প্রথম ভর্তি হতে আসে তাদের একটা বিরাট অংশ রিকেট রোগে পীড়িত, এবং কিছুদিন খোলা আলো-বাতাসে থাকার পর আরোগ্য লাভ করে। দ্বিতীয় প্রয়োজন হল উপযুক্ত খাবার। এটা খুর ব্যয়বহুল ব্যাপার নয় এবং তত্ত্বগতভাবে হয়তো গৃহে ভালো খাবার সরবরাহ করা যায় তবে বাস্তবে কিন্তু একেবারেই সম্ভব নয়। কারণ সুষম খাদ্য বিষয়ে উপযুক্ত জ্ঞানের অভাব এবং অহেতুক রক্ষণশীলতা রয়েছে। তৃতীয় প্রয়োজন একটু পরিসরের। শিশুদের লম্ফ-জম্ফ ও খেলাধুলা করার সুযোগ থাকা দরকার। দরিদ্র ছেলেরা রাস্তায় খেলাধুলা করতে পারে, কিন্তু অন্যদের নিষেধ করা হয়। সে যাই হোক, রাস্তা কিন্তু খেলাধুলার জন্য উপযুক্ত জায়গা নয়। চতুর্থ প্রয়োজন হল হট্টগোল করার সুযোগ। ছেলেরা একটু হট্টগোল করবেই, এতে বাধা দিতে নেই: ছেলেদের হট্টগোলে বাধা দিলে নির্দয়তাই প্রকাশ পাবে। কিন্তু একটি বাড়িতে যদি একাধিক শিশু থাকে এবং তারা একযোগে হট্টগোল শুরু করে দেয় তা হলে বড়দের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। পঞ্চম প্রয়োজন হল সঙ্গী হিসেবে সমবয়সীদের পাওয়া। এই প্রয়োজন শুরু হয় দ্বিতীয় বর্ষের শেষ দিকে, তারপর থেকে প্রযোজনটা দ্রুত বাড়তে থাকে। ষষ্ঠ প্রয়োজন হল পিতামাতার নিরন্তর আদর থেকে অব্যাহতি। ধনাঢ্য পিতামাতার সন্তানদের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্রের ব্যাপারটা আলাদা। দরিদ্র পিতামাতার জীবিকার সন্ধানে এবং সাংসারিক কাজকর্মে এতটা ব্যস্ত থাকতে হয় যে তারা সন্তানের প্রতি নজরই দিতে পারেন না। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পিতামাতারাও সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত নজর দিয়ে তাদের ক্ষতিসাধন করে। সপ্তম প্রয়োজন হল উপযুক্ত পরিবেশ, যেখানে আমোদ-প্রমোদের যথার্থ সুযোগ এবং উপকরণ রয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কাচ-পাথর ইত্যাদির মতো আজেবাজে জিনিস যেন শিশুর নাগালের মধ্যে না থাকে। শিশুর ছয় বছর বয়স পর্যন্ত যদি এই প্রয়োজনগুলো মেটানো না হয় তা হলে তারা রুগ্ন, উদ্যমহীন এবং দুর্বল মনের অধিকারী হবে।
বড় শহরে শিশুদের যত্নের ভেতর রাখার সমস্যা সম্পর্কে আধুনিক রাষ্ট্রের কোনো সচেতনতা নেই। এটি একটি স্থাপত্যশিল্পগত প্রশ্ন। যেমন ধরুন শহরের দরিদ্র এলাকায় অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করা উচিত খোলা চত্বরের তিন দিক ঘিরে। দক্ষিণ দিকটা খোলা থাকবে সূর্যালোক প্রবেশের জন্য। মাঝখানের খোলা জায়গা নির্দিষ্ট থাকবে শিশুদের জন্য। এখানে ছেলেরা বড়দের তত্ত্বাবধানে খেলা করবে, আহার্য গ্রহণ করবে, তারপর ঘুমানোর জন্য পিতামাতার কাছে ফিরে যাবে। এতে মায়েরা নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় পাবে, শিশুরাও অত্যন্ত উপকৃত হবে। কিন্তু স্বতন্ত্র বাড়ি এটা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে রেখেছে।
হয়তো ধনী লোকেরা তাদের সন্তানদের গোষ্ঠী মালিকানার মাঠে খেলতে দেবে না। কিন্তু দিনের একটা অংশ মুক্তস্বাধীন থাকা, ইচ্ছেমতো একটু খেলাধুলা করা দরিদ্র ছেলেদের যেমন দরকার ধনী ছেলেদেরও তেমন দরকার। শহরের একটা বাড়ি, তা যত সুন্দরই হোক না কেন, শিশুর সুস্থ মানসিক ও শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করতে পারে না। উচ্চ মূল্য দিয়ে উচ্চ সমাজে মেশা যায়, কিন্তু যে কোনো শ্রেণীর জন্য কোনো-না-কোনো ধরনের নার্সারি স্কুল অত্যাবশ্যক।
যাকে আমরা প্রাক-বিদ্যালয় সময়কাল বলি তা নিয়ে এতক্ষণ আমরা আলোচনা করেছি। শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে বোর্ডিং স্কুলের পক্ষে যুক্তিগুলো আরো জোরালো হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে জোরালো যুক্তিটি হল আবাসিক স্কুল দেশের সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা এবং পরিবেশে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। পক্ষান্তরে সাধারণ স্কুল অধিকাংশ ছেলের জন্য শহরে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আরো একটি যুক্তি, এই যুক্তিটা অবশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে খাটলেও সব ক্ষেত্রে খাটে না। গৃহে থাকলে শিশুকে অযথা স্নায়ুর চাপে ভুগতে হয়। হয়তো পিতামাতা বাড়িতে ঝগড়া-বচসায় লিপ্ত হলো, হয়তো মাতা শিশুর জন্য অতিরিক্ত উদ্বেগাকুল, হয়তো পিতার মধ্যে দয়ার ভাগটা কম; হয়তো অন্য ভাই বা বোনকে অতিরিক্ত স্নেহ করা হয়, এতে যাকে বা যাদের কম ভালবাসা হয় তাদের মধ্যে হিংসার উদ্রেক করে। পিতামাতার মধ্যে একজন অন্যায়ভাবে স্নেহশীল হতে পারেন। আসলে বাড়ি খুব বেশি আবেগ-কাতর। শিশুদের দরকার শান্ত, নির্ঝাঞ্ঝাট জীবন-যাপন, আমোদ-প্রমোদপূর্ণ জীবন; তাদের যেন তীব্র, তীক্ষ্ণ কোনো আবেগ স্পর্শ না করে। আবার পিতামাতার বিজ্ঞ আদর-সোহাগ শিশুর জন্য অত্যন্ত মঙ্গলজনক। এতে তার মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জাগবে, মানবসন্তান হিসেবেও সে নিজের মূল্য বুঝবে। তবে এই পরস্পরবিরোধী যুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ কাজ নয়।
গৃহ বনাম স্কুল প্রশ্ন নিয়ে বিমূর্তভাবে যুক্তি অবতারণা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। আদর্শ গৃহের সঙ্গে স্কুলের তুলনা করলে, ভারসাম্য একদিকে ঝুঁকে পড়বে; আদর্শ স্কুলের সঙ্গে প্রকৃত বাড়ির তুলনা করলে ভারসাম্য অপর দিকে ঝুঁকবে। আমার কাছে এটা নিঃসন্দেহ ব্যাপার বলেই মনে হয় যে আদর্শ গৃহের চেয়ে আদর্শ স্কুল অনেক ভালো, অন্তত শহুরে বাড়ির চেয়ে স্কুল অনেক ভালো। কারণ এখানে আলো-বাতাস বিস্তর মেলে, চলাফেরার স্বাধীনতাও অনেক বেশি, এবং সমবয়সী অনেক সঙ্গী সহজে পাওয়া যায়। তাই বলে কিন্তু প্রকৃত স্কুল প্রকৃত বাড়ির চেয়ে উন্নত নয়। অধিকাংশ পিতামাতা সন্তানের জন্য মায়া-মমতা অনুভব করেন। আর এটাই তারা সন্তানদের যে ক্ষতি করেন তা একটা সীমার মধ্যে বেঁধে রাখে। কিন্তু শিক্ষা-কর্তৃপক্ষ ছেলেদের জন্য কোনো প্রকার মায়া-মমতা অনুভব করেন না। খুব বেশি হলে তারা গোটা সমাজের জন্য কিছু করেন, একান্তভাবে শিশুদের জন্য ভাবেন না। তাছাড়া রাজনীতিকদের মতো কিছু পাওয়ার আশায় হৈ চৈ করেন।
বর্তমানে তরুণদের মানসিক গঠনের জন্য গৃহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ভূমিকা নির্ভেজাল কল্যাণকর নয়। কিন্তু রাষ্ট্র ছেলেদের এককভাবে কর্তৃত্ব গ্রহণ করলে যে ভূমিকা পালন করবে তার চেয়ে ঢের ভালো। গৃহ শিশুকে স্নেহ-মমতার অভিজ্ঞতা যোগায়, গৃহে সে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে বাস করে বলে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে সক্ষম হয়, একই সঙ্গে নর ও নারীর সঙ্গ পায়। সর্বোপরি, পূর্ণবয়স্কদের জীবন-যাপনের রীতিনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভ করতে পারে। বস্তুত, স্কুলের কৃত্রিম সারল্যের সংশোধক হিসেবে গৃহ প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখে।
গৃহের আর একটি গুণ এই যে, গৃহ বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে বৈচিত্র্য রক্ষা করে। আমরা সবাই যদি এক রকম হতাম, তা হলে আমলা ও পরিসংখ্যানবিদদের হয়তো খুবই সুবিধা হত, কিন্তু জীবন হত নিষ্প্রাণ, আর সমাজটা হত অপ্রগতিশীল। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য থাকার জন্য দায়ী স্বতন্ত্র বাড়ি। বড় বেশি পার্থক্য সামাজিক সংহতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে, কিন্তু সহযোগিতার জন্য কিছুটা পার্থক্য আবশ্যক। একটা অর্কেস্ট্রার জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রতিভার লোকের দরকার, তাদের রুচিরও কিছু পার্থক্য থাকা আবশ্যক; সবাই যদি ট্রমবন চালনার জন্য জেদ ধরেন, তা হলে অর্কেস্ট্রা অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। সামাজিক সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন ধরনের রুচি এবং ঝোঁক-বিশিষ্ট লোকের আবশ্যকতা রয়েছে। এখন যদি শিশুকে একইভাবে লালন-পালন করা হয়, একই পরিবেশে বড় হয়ে উঠতে দেওয়া হয় তা হলে ভিন্ন ভিন্ন রুচির মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এজন্যই শিশুদের পিতামাতার কাছেও থাকা দরকার। বিভিন্ন পিতামাতার মেজাজ ও রুচি নিশ্চয় বিভিন্ন হবে। আর এটা প্লেটোর তত্ত্বের বিপক্ষে সব চেয়ে জোরালো যুক্তি। প্লেটো প্রস্তাব করেছিলেন যে, সব শিশুই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে লালিত-পালিত হবে।
Manosh Roy Purohit