ইরান যুদ্ধে যেভাবে বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চল
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ইরানিদের আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে‼️
✍🏻ক্যাথলিকদের বিশ্বাস, স্বর্গ ও নরকের মাঝখানে একটি জায়গা আছে, যার নাম লিম্বো। স্বর্গে যেতে হলে এই লিম্বো পেরিয়ে যেতে হবে; কিন্তু কবে, কখন, কীভাবে এই লিম্বো পেরোবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তি নিয়ে আমরা এখন এই ‘লিম্বো’তে রয়েছি। শান্তির পথে অর্ধেক এগিয়ে এসেছি, কিন্তু বাকি অর্ধেক কবে পেরোব, কেউ বলতে পারে না। এখনকার অবস্থা না স্বর্গ, না নরক। না যুদ্ধ, না শান্তি।
চুক্তি হচ্ছে–হবে বলে কথা–চালাচালির প্রায় দুই মাস হতে চলল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার নতুন করে হামলা শুরুর হুমকি দিচ্ছেন, আবার পরক্ষণেই বলছেন, চুক্তি প্রায় প্রস্তুত। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলছেন, খুব শিগগির এই চুক্তি হবে বলে মনে হয় না। ট্রাম্পের সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন, এই চুক্তি তাঁর চাই-ই চাই, কিন্তু ইরান গোঁ ধরে বসে আছে, তার শর্ত পূরণ না হলে সে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করবে না। সে বুঝে গেছে, ট্রাম্পের হাতে সময় নেই, কিন্তু তার হাতে বিস্তর সময়।
এদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বশর্ত হিসেবে নতুন এক গেরো পাকিয়ে বসেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, একাধিক আরব ও মুসলিম দেশকে ‘বাধ্যতামূলকভাবে’ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের লক্ষ্যে তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। ইরান যুদ্ধের সঙ্গে আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্পর্ক কী, সেটা বোঝা দুষ্কর। সে কারণে অধিকাংশ আরব রাজধানীতেই ট্রাম্পের এই দাবি ভ্রু-কুঞ্চনের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম দফা শাসনামলে উপসাগরের দুই দেশ, আরব আমিরাত ও বাহরাইন—ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। মরক্কো ও সুদানের মতো দেশকেও এই চুক্তিতে ভেড়ানো গিয়েছিল। কিন্তু আসল ‘প্রাইজ’ সৌদি আরব, এই প্রশ্নে এক পা এগিয়ে দুই পা সরে এসেছে। চুক্তি স্বাক্ষরে তারা রাজি, তবে তার আগে ফিলিস্তিন প্রশ্নে স্পষ্ট অগ্রগতি অর্জন করতে হবে, এই দাবি তাদের। গাজায় ও লেবাননে অব্যাহত গণহত্যার পর শান্তি স্থাপন প্রশ্নে সৌদি অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
এ ছিল ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থা। এখন, এই যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পর অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর, বিশেষ করে সৌদি আরবের ইরানের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রবল রকম নেতিবাচক। ইসরায়েলকে নিয়ে তাদের যত ভয়, তার চেয়ে বেশি ইরানকে নিয়ে। সিকি শতক আগে সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছিলেন, ইরানকে যেন এমন শাস্তি দেওয়া হয়, যাতে সে আর মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেছিলেন, এই ‘বিষধর সাপের’ মাথাটা কেটে ফেলুন।
বাদশাহ আবদুল্লাহ আর নেই, সে দেশের প্রকৃত ক্ষমতা এখন তাঁর ভাতিজা মোহাম্মদ বিন সালমানের হাতে। ইরানের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও এক। চলতি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পেছনে তাঁর উসকানি ছিল, এ কথা একাধিক মার্কিন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এ কথা মোটেই গোপন নয় যে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় সব দেশই ইরানের ব্যাপারে সন্দিহান। শিয়া-সুন্নি বিবাদ তো রয়েছেই, কিন্তু আসল গেরো আঞ্চলিক আধিপত্য প্রশ্নে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরান সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। গায়ে–গতরেও অন্য সবার চেয়ে সে বড়। সে কারণে এই ইরানি সাপের মাথাটা যদি ছেঁটে ফেলা যায়, তাহলে মন্দ হয় না।
সমস্যা হলো, পৃথিবীর দুই প্রধান সামরিক শক্তির একযোগে হামলার পরও সে সাপের মাথাটা ছেঁটে ফেলা গেল না। লাগাতার বিমান হামলার ফলে সামরিকভাবে তাকে কাবু করা গেলেও কৌশলগতভাবে তাকে কাবু করা যায়নি। হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের আধিপত্য সরবে ঘোষণা করে উপসাগরীয় দেশগুলো তো বটে, সারা বিশ্বকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে সে।
বিবাদ থেকে সহযোগিতা
ইরান যুদ্ধের একটা অভাবিত প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই যে এক আরব আমিরাত ছাড়া উপসাগরের অন্য সব দেশই এখন ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা ও সহাবস্থানের নীতি অনুসরণের কথা ভাবছে। কথায় বলে, হারাতে না পারলে হাত মেলাও। উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝে গেছে, এই অঞ্চলে যদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হয়, তাহলে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত মৈত্রী বজায় রাখতে হবে। মার্কিন সামরিক বহর রেখে বা ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ হবে না।
উপসাগরের দেশগুলোর মধ্যে যে সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ ঘটছে, সে কথা অন্য কেউ নয়; খোদ ইসরায়েল থেকেই স্বীকার করা হয়েছে। সে দেশের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজদের স্বার্থে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত আঁতাতের কথা ভাবছে। সুপরিচিত ভাষ্যকার জিভি বারেল লিখেছেন, আব্রাহাম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির শর্ত জুড়ে ট্রাম্প যখন এক কল্পজগতে বাস করছেন, ঠিক তখন উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে সঙ্গে নিয়ে নতুন জোট গঠনে উদ্যোগী হয়েছে।
একই কথা বলেছেন চীনা-আমেরিকান ভাষ্যকার ফ্রেড ডি টেং। এক সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে একটি নতুন ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠন। এটি যতটা না সামরিক, তার চেয়ে বেশ হবে কৌশলগত। সৌদি আরব ও ইরান ছাড়া অন্য যে দেশটি এই কৌশলগত আঁতাতে যুক্ত হতে পারে সে হলো পাকিস্তান এবং অদৃশ্য যোগসূত্র হিসেবে চীন। তিন বছর আগে চীনা দূতিয়ালিতে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছে। গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে যে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে সৌদি আরব এখন পাকিস্তানি পারমাণবিক প্রতিরক্ষাব্যূহের অন্তর্গত, তার পেছনেও একটি অলক্ষ্য শক্তি ছিল চীন।
ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে এই যে নতুন কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তার একটা প্রধান কারণই হলো সামরিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল অবস্থান। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে তাদের প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র হয় পর্যাপ্ত সমর্থন দিতে অক্ষম অথবা অনাগ্রহী হবে। এই যুদ্ধেই দেখা গেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে ওয়াশিংটন ব্যস্ত থেকেছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বেশ বুঝতে পেরেছে, ইরান তাদের জন্য একটি অব্যাহত উদ্বেগের কারণ বটে, কিন্তু তার চেয়েও বড় উদ্বেগ আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা। এই অঞ্চলের দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোত যে অভাবিত সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, তার মুখ্য কারণ ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে তাদের সুখ্যাতি। এখানে রাজনৈতিক সংকট নেই, যুদ্ধবিগ্রহ নেই, ফলে চুটিয়ে ব্যবসায় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এবারের যুদ্ধ থেকে বোঝা গেল, ইরানকে ঘাঁটালে বিপদ আছে। ফলে সামরিক পথে ইরানকে কাবু করার বদলে তার সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর জোট গড়ে তোলার কথা উঠেছে।
আম ও ছালা
একাধিক আরব ভাষ্যকার এই নয়া মেরুকরণের সম্ভাবনার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইয়াসমিন ফারুক ও আবদেল আজিজ সাগেরের মতো সুপরিচিত আরব ভাষ্যকার। তাঁরা দুজনেই বলেছেন, ইরানকে বাদ দিয়ে বা তার বিরুদ্ধে জোট বেঁধে উপসাগরীয় নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা কোনোটাই অর্জিত হবে না। গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক নিবন্ধে ইয়াসমিন ফারুক বলেছেন, ইরান বিশাল একটি দেশ, সে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিকট প্রতিবেশী। চাইলেও তাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। অতএব, উপসাগরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইরানের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খোলা রাখতেই হবে। অন্যদিকে আবদেল আজিজ সাগের বলেছেন, ইরানকে একঘরে করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘাড়ে বন্দুক রাখলে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আম ও ছালা দুটোই হারাবে।
নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যাদের দরকার, সেই উপসাগরীয় দেশগুলোকেই ঠিক করতে হবে কীভাবে তারা এই দুই লক্ষ্য অর্জন করবে। ইরানকে বাদ দিয়ে কোনো ‘নিরাপত্তা স্থাপত্য’ নির্মাণ সম্ভব হবে না, সে কথা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
● হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।©
* মতামত লেখকের নিজস্ব
Lore Prince Academy
Driven by purpose, powered by learning,Balancing job, study, and self-growth every day. Recharging my mind with knowledge and new ideas.
Passionate about education, discipline, and progress. Building a brighter future through continuous learning. ✨
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংক (World Bank) ২০২৬ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে তাদের সর্বশেষ যে পূর্বাভাস ও প্রক্ষেপণ দিয়েছে, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) প্রবৃদ্ধি
IMF-এর পূর্বাভাস: ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৭% হতে পারে বলে IMF DataMapper-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরবর্তী অর্থাৎ ২০২৭ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৪.৩% হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস: বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের চেয়ে কমিয়ে ৩.৯% নির্ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই তারা এই প্রবৃদ্ধি হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছে।
২. মূল্যস্ফীতি (Inflation)
IMF-এর পূর্বাভাস: ২০২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী বা প্রায় ৯.২%-এর কাছাকাছি থাকতে পারে বলে আইএমএফ ধারণা করছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস: বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৯.১%-এর আশেপাশে থাকতে পারে, যা গত বছরের (১০%) তুলনায় সামান্য কম হলেও সাধারণ মানুষের জন্য এখনও বেশ চাপ সৃষ্টি করবে।
৩. প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ
উভয় সংস্থাই বাংলাদেশের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে:
রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাত: রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা দূর করে সুশাসন ফিরিয়ে আনা দেশের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের (NPL) হার বৃদ্ধি বড় চিন্তার কারণ।
বৈদেশিক ধাক্কা: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আমদানি খরচ বাড়িয়ে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি (Current Account Deficit) বৃদ্ধি করতে পারে।
দরিদ্রতা ও কর্মসংস্থান: বিশ্বব্যাংকের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধির কারণে ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার সামান্য বেড়ে ৮.৭% হতে পারে এবং কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যেতে পারে।
"শূন্য পকেটে কাউকে জ্ঞান দিতে নেই। কারণ পৃথিবী আপনার কথা শোনার আগে আপনার অবস্থান দেখে। বাস্তবতা হলো, অভাবের সময়ে উপদেশের চেয়ে সামর্থ্যের মূল্য বেশি দেওয়া হয়। তাই আগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুন, তারপর আপনার কথারও মূল্য হবে।" 🫥
04/06/2026
01/06/2026
আর কিন্তু তিনদিন বাকি আবেদন করে নেন
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Chittagong