05/06/2026
পড়ুন আজকের (০৫.০৬.২০২৬) 'উত্তরের সারাদিন'পত্রিকার বিশেষ প্রবন্ধ। সিন্ধু সভ্যতার পশুপতি সিল বিতর্ক
সভ্যতার আত্ম-পরিচয় নির্মাণে প্রত্নতত্ত্ব অবিসংবাদিত ভূমিকা পালন করে থাকে। একথা স্থান, কাল নির্বিশেষে বিশ্বের সব সভ্যতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কেননা, সাংস্কৃতিক এই উত্তরাধিকারের ভিত্তিতেই জনপদের নিজস্ব পরিচয়টি লুকিয়ে থাকে। মহেঞ্জোদারোর বিখ্যাত 'পশুপতি সিল' এই ধরনেরই একটি প্রত্ননিদর্শন। গত এক শতাব্দী ধরে এই ক্ষুদ্র স্টিয়াটাইট সিলকে ঘিরে গবেষক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ধর্মতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। এটি কি প্রকৃতপক্ষে হিন্দু ধর্মের দেবতা শিবের প্রাচীনতম রূপ? নাকি এটি কেবলমাত্র সিন্ধু সভ্যতার এক অজানা দেবতা, যার সঙ্গে পরবর্তী হিন্দুধর্মের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই- এই বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
বিশ্বের প্রাচীনতম নগরসভ্যতাগুলির মধ্যে সিন্ধু সভ্যতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সভ্যতা বর্তমান পাকিস্তান, উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশ জুড়ে বিকশিত হয়েছিল। এর প্রধান নগরকেন্দ্র ছিল মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, ধোলাভিরা, রাখিগড়ি, কালিবঙ্গান এবং লোথাল। সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর সুপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা। প্রশস্ত রাস্তা, উন্নত নিকাশী ব্যবস্থা, মানসম্মত ইট নির্মাণ, শস্যভাণ্ডার, বিনোদন ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্রসমূহ এই সভ্যতার উন্নত সাংগঠনিক কাঠামোর পরিচয় দেয়। মিশর ও মেসোপটেমিয়ার সমসাময়িক হলেও সিন্ধু সভ্যতা অনেক ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে হাজার হাজার সিল আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলির অধিকাংশেই প্রাণীচিত্র এবং অদ্যাবধি অপাঠ্য।
মহেঞ্জোদারোর যে অংশটি(পাকিস্তানের সিন্ধুপ্রদেশে)প্রত্নতাত্ত্বিক কে. এন. দীক্ষিত খনন করিয়েছিলেন, যা তাঁর নাম অনুসারে DK-G নামে চিহ্নিত, সেখানে আবিষ্কৃত সিল- 420 বা DK-G 27-কে পরবর্তীকালে 'পশুপতি সিল' নামে পরিচিত করা হয়। সিলটি স্টিয়াটাইট পাথরে নির্মিত এবং এর কেন্দ্রে একটি শিংযুক্ত মানবাকৃতি দেখা যায়। চরিত্রটি এমন একটি ভঙ্গিতে বসে আছে যা অনেক গবেষকের মতে যোগাসনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। চিত্রটির চারদিকে চারটি প্রধান প্রাণী দেখা যায়—হাতি, গণ্ডার, মহিষ এবং বাঘ। নিচের অংশে দুটি হরিণ বা ছাগলসদৃশ প্রাণীর উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। সিলের উপরের অংশে কয়েকটি হরপ্পার চিহ্ন খোদিত রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত হরপ্পা লিপি আজও পাঠোদ্ধার করা যায়নি। ফলে সিলটির প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এই অজানা লিপিই মূলত বিতর্কের কেন্দ্রীয় কারণ। যদি লিপিটি পাঠোদ্ধার করা যেত, তবে হয়তো চরিত্রটির পরিচয় সম্পর্কে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া যেত।
১৯৩১ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক জন মার্শাল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Mohenjo-daro and the Indus Civilization'-এ প্রথম পশুপতি সিলকে 'প্রোটো-শিব' হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। মার্শালের যুক্তি ছিল— এই সিলে অধিষ্ঠানরত মূর্তিটি পদ্মাসনের অনুরূপ একটি আসনে বসে আছে। শিবকে পরবর্তী হিন্দুধর্মে 'মহাযোগী' বা 'পশুপতি' হিসেবে দেখা হয়। সিলের চারদিকে বিভিন্ন প্রাণীর উপস্থিতি দেখে মার্শাল এটিকে 'শিব'-রূপে প্রতিপন্ন করেন। তিনি মনে করেন শিংযুক্ত মুকুট পরবর্তী শৈব প্রতীকের সঙ্গে কোনো পুরাতন সংযোগ নির্দেশ করতে পারে। কিছু গবেষকের মতে, কেন্দ্রীয় চরিত্রটির তিনটি মুখ থাকতে পারে। পরবর্তী হিন্দুধর্মে শিবের ত্রিমুখী বা বহুমুখী রূপের সঙ্গে এর তুলনা করা হয়েছে। এই যুক্তিগুলির ভিত্তিতে মার্শাল ঘোষণা করেন যে, এটি সম্ভবত শিবের আদিমতম প্রতিরূপ।
অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক মনে করেন জন মার্শাল পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় ধারণাকে অতীতের উপর আরোপ করেছিলেন। গ্রেগরি পোসেহল(Gregory Possehl)-সহ বহু গবেষক বলেন, সিলে কোথাও 'শিব' নামের উল্লেখ নেই। সুতরাং এটিকে 'শিব' বলে চিহ্নিত করা সম্পূর্ণভাবে অনুমাননির্ভর। প্রখ্যাত জার্মান ভারততত্ত্ববিদ ডোরিস মেথ শ্রীনিবাসন (Doris M**h Srinivasan) যুক্তি দেন যে, চরিত্রটি সম্ভবত কোনো মানব শাসক, পুরোহিত বা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো দেবতা হতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন এটি প্রকৃত যোগাসন নয়; বরং শিকারি বা আচারগত ভঙ্গি হতে পারে। আবার অনেক গবেষক মনে করেন, তিনটি মুখের ধারণা চিত্রের অস্পষ্টতার কারণে তৈরি হয়েছে এবং এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না। ফলে 'প্রোটো-শিব' ব্যাখ্যাকে আকর্ষণীয় হলেও অপ্রমাণিত অনুমান হিসেবে দেখা হয়।
পশুপতি সিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ব্যাখ্যা হলো এটি 'Lord of Animals' মোটিফের অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন বিশ্বের বহু সভ্যতায় এমন দেবতা বা প্রতীক দেখা যায়, যিনি পশুদের নিয়ন্ত্রণ করছেন বা পশুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। উদাহরণস্বরূপ— মেসোপটেমিয়া, এলামাইট, মিনোয়ান সভ্যতার কথা উল্লেখ্য। সেখানকার শিল্পরীতিতে শিংযুক্ত দেবতা, পশুচক্র এবং মানব-পশু প্রতীক বারবার দেখা যায়।
এই কারণে কিছু গবেষক মনে করেন পশুপতি সিল কোনো স্বতন্ত্র ভারতীয় ধর্মীয় প্রতীক নয়; বরং বৃহত্তর ব্রোঞ্জ যুগের সাংস্কৃতিক জগতের অংশ।
সম্প্রতি আমেরিকার রুটগার্স ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া ইতিহাস বিষয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক অড্রে ট্রুশকে পশুপতি সিল বিষয়ে নতুন বিতর্কের অবতারণা করেছেন। তিনি সিন্ধু সভ্যতার সুবিখ্যাত পশুপতি শীলকে শিবের প্রতিমূর্তি হিসাবে মেনে নিতে গড় রাজি হয়েছেন এবং ভারতের সরকারি ব্যাখ্যার তীব্র বিরোধিতা করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মতে—হরপ্পা লিপি এখনও অপাঠ্য এবং কোথাও শিবের নাম উল্লেখ নেই। ইউরেশীয় অঞ্চলে অনুরূপ মোটিফ বিদ্যমান। তাঁর বিশেষ প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ইতিহাসকে আধুনিক জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যার পরিবর্তে প্রমাণনির্ভরভাবে দেখা উচিত। উক্ত মতের বিরোধিতা করেছেন অমীশ ত্রিপাঠি। তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁর 'শিব ট্রিলজি' সিরিজের জন্য। তাঁর তিনটি বিখ্যাত গ্রন্থ হল-'The Immortals of Meluha', 'The Secret of the Nagas', এবং 'The Oath of the Vayuputras'।
অমীশের গ্রহণযোগ্য যুক্তিটি হলো, কোন সভ্যতা যখন সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার পথে অগ্রসর হয়, তখন প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে একটা যোগসূত্র রয়ে যায়। জনপ্রিয় লেখক অমীশ ত্রিপাঠী মনে করেন যে, সিন্ধু সভ্যতায় আবিষ্কৃত সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো এই সিলমোহর টি (যেখানে যোগাসনে বসা একটি শিংযুক্ত মানব মূর্তি ও ভারতীয় বন্যপ্রাণী দেখা যায়) শুধুমাত্র একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়। এটি শিব উপাসনার সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত বা চিত্রিত প্রমাণ। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, এই সীলমোহরে খোদাই করা হাতি, বাঘ, গন্ডার এবং জলহস্তির মতো প্রাণীগুলো সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় উপমহাদেশীয়। এছাড়াও এর যোগাসন মূর্তি সনাতন ধর্মের সাথে গভীর যোগসূত্র স্থাপন করে। তিনি যুক্তি দেন যে, পশুপতি সিলকে কেবলমাত্র “প্রোটো-এলামাইট” বা 'Lord of Animals' মোটিফের অংশ বলে ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত সরলীকৃত সিদ্ধান্ত। তিনি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার ধারণাকে গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক স্মৃতি। মিশর বা মেসোপটেমিয়ার মতো বহু সভ্যতা রাজনৈতিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বহু উপাদান হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে। তাই সিন্ধু সভ্যতা এবং পরবর্তী হিন্দু সংস্কৃতির মধ্যে কিছু ধারাবাহিকতা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে একজন ইতিহাসবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে হয় ত্রিপাঠির যুক্তিগুলি অনুমানভিত্তিক; প্রত্যক্ষ প্রমাণনির্ভর নয়।
পশুপতি সিল নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগ।
অনেক গবেষক মনে করেন, সিলের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি যে ভঙ্গিতে বসে আছে তা 'মূলবন্ধাসন' বা 'কায়োৎসর্গ'-সদৃশ একটি ধ্যানমগ্ন আসনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে যোগের উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। প্রথাগতভাবে যোগের প্রাচীনতম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ঋকবেদ, কঠোপনিষধ এবং পরবর্তীতে পতঞ্জলির 'যোগসূত্র'-তে। কিন্তু যদি পশুপতি সিল সত্যিই ধ্যানচর্চার কোনো প্রতীক হয়, তাহলে যোগের ইতিহাসকে আরও অন্তত এক সহস্রাব্দ পেছনে নিয়ে যেতে হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যোগ কেবল একটি ধর্মীয় অনুশীলন নয়; এটি একটি দেহ-মন- নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। অতএব কোনো ব্যক্তিকে ক্রস-লেগড বা ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখলেই তাকে যোগী বলা যায় না। তবুও প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে দেখা যায় যে সিন্ধু সভ্যতা থেকে এমন আরও কয়েকটি মূর্তি পাওয়া গেছে যেগুলিতে ধ্যানমগ্ন ভঙ্গির ইঙ্গিত রয়েছে। ফলে কিছু গবেষক মনে করেন যে ধ্যান ও তপস্যাভিত্তিক আধ্যাত্মিকতার কোনো প্রাথমিক রূপ সেখানে বিদ্যমান থাকতে পারে। স্বস্তিক মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন প্রতীক। এটি সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন সিল ও মৃৎপাত্রে পাওয়া গেছে। পরবর্তীকালে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মে এই প্রতীক শুভশক্তি, সমৃদ্ধি ও মহাজাগতিক ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক মনে করেন, স্বস্তিকের দীর্ঘ ব্যবহার একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতির ইঙ্গিত বহন করে। আবার অন্যরা বলেন, স্বস্তিক এতটাই সাধারণ জ্যামিতিক নকশা যে এটি বিভিন্ন সভ্যতায় স্বাধীনভাবে উদ্ভূত হতে পারে। অতএব স্বস্তিক একাই সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা প্রমাণ করতে পারে না, তবে এটি ধারাবাহিকতার সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করে।
পশুপতি সিল নিয়ে বিতর্ক কেবল একাডেমিক নয়; এটি আধুনিক পরিচয় রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। ভারতে সিন্ধু সভ্যতার উত্তরাধিকার নিয়ে অন্তত তিনটি প্রধান ধারা দেখা যায়। প্রথম ধারা মনে করে, সিন্ধু সভ্যতা মূলত বৈদিক-হিন্দু সংস্কৃতির পূর্বসূরি। দ্বিতীয় ধারা মনে করে, সিন্ধু সভ্যতা এবং বৈদিক সংস্কৃতি পৃথক ঐতিহাসিক পরম্পরা। তৃতীয় ধারা মনে করে, দুইয়ের মধ্যে সংঘর্ষ নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক মিশ্রণ ঘটেছিল। পশুপতি সিল এই বৃহত্তর বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কারণ যদি এটি শিবের প্রাচীনতম রূপ হয়, তাহলে হিন্দুধর্মের শিকড় অনেক গভীর অতীতে প্রসারিত হয়। আর যদি তা না হয়, তাহলে ভারতীয় ধর্মীয় ইতিহাসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। পশুপতি সিলকে ঘিরে বিতর্কের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এর সঙ্গে ভারতীয় ইতিহাসচর্চার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক—আর্য প্রশ্ন—ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তিতে একটি ধারণা গড়ে ওঠে যে বৈদিক আর্যরা ভারতবর্ষের বাইরে থেকে এসেছিল। পরবর্তীকালে এই ধারণা 'আর্য অভিভাষণ তত্ত্ব' নামে পরিচিত হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সিন্ধু সভ্যতার পতনের পর বা তার অন্তিম পর্যায়ে আর্যভাষী জনগোষ্ঠী উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। যদি এই তত্ত্ব গ্রহণ করা হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং বৈদিক ধর্মের মধ্যে সম্পর্ক কী ছিল? একদল গবেষক মনে করেন, পশুপতি সিল এমন এক ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে যা বৈদিক ধর্মের বাইরের ছিল এবং পরে শৈবধর্মে রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে অনেক গবেষক যুক্তি দেন যে বৈদিক ও হরপ্পীয় সংস্কৃতির মধ্যে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার ধারণা অতিরঞ্জিত। দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক সংমিশ্রণ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।
বর্তমান গবেষণায় ক্রমশ একটি মধ্যপন্থী অবস্থান গুরুত্ব পাচ্ছে। এই অবস্থান অনুসারে, ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসকে আর্য বনাম অনার্য- এই দ্বৈত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার ফল হিসেবে প্রতিভাত করার প্রচেষ্টা লক্ষনীয়।
পশুপতি সিল নিয়ে মতভেদের পেছনে কেবল তথ্যগত নয়, পদ্ধতিগত কারণও রয়েছে। একদল গবেষক প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের ব্যাখ্যায় তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে গুরুত্ব দেন। তাঁরা সাদৃশ্য, ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক স্মৃতির ধারণা ব্যবহার করেন। অন্যদিকে আর এক দল গবেষক কঠোর প্রমাণনির্ভর অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁদের মতে, কোনো দাবি তখনই গ্রহণযোগ্য যখন তার প্রত্যক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক বা পাঠ্যভিত্তিক প্রমাণ থাকে। এই দুই পদ্ধতির সংঘর্ষ থেকেই পশুপতি সিলের মতো বিষয় নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়।
ইতিহাসচর্চায় এটি অস্বাভাবিক নয়। প্রকৃতপক্ষে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্নের ক্ষেত্রেই একই তথ্য থেকে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি বিষয় মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়: প্রথমত, সিলটি সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বা প্রতীকী নিদর্শন। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় চরিত্রটির সঙ্গে পশু, শিং এবং বিশেষ ভঙ্গির সম্পর্ক রয়েছে। তৃতীয়ত, সিলটির চিত্ররীতি প্রাচীন ইউরেশীয় “Lord of Animals” মোটিফের সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য বহন করে। চতুর্থত, পরবর্তী শৈব ঐতিহ্যের কিছু উপাদানের সঙ্গে এর আংশিক মিল রয়েছে। কিন্তু নিম্নলিখিত বিষয়গুলি এখনও অপ্রমাণিত—১) এটি নিশ্চিতভাবে শিব কি না। ২) এটি যোগের প্রমাণ কি না। ৩) এটি কোনো নির্দিষ্ট দেবতার প্রতিরূপ কি না। ৪) এটি পরবর্তী হিন্দুধর্মের প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি কি না।
অতএব “এটি অবশ্যই শিব” এবং “এটির সঙ্গে শিবের কোনো সম্পর্কই নেই”—উভয় অবস্থানই বর্তমান প্রমাণের তুলনায় অতিরিক্ত দৃঢ়।
পশুপতি সিল নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো হরপ্পা লিপির পাঠোদ্ধার। যদি কখনও এই লিপি পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়, তাহলে সিন্ধু সভ্যতার ধর্ম, সমাজ ও প্রশাসন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আমূল পরিবর্তিত হতে পারে।এছাড়া— নতুন প্রত্নস্থলের আবিষ্কার, উন্নত ডিজিটাল ইমেজ বিশ্লেষণ, প্রত্নজীববৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ, আন্তঃসভ্যতাগত তুলনামূলক গবেষণা এই বিতর্ককে আরও নতুন মাত্রা দিতে পারে। ইতিহাসের বহু রহস্যের মতো পশুপতি সিলের রহস্যও হয়তো ভবিষ্যতের গবেষণায় আরও স্পষ্ট হবে।
মহেঞ্জোদারোর পশুপতি সিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং রহস্যময় নিদর্শন। প্রায় এক শতাব্দী ধরে এটি শিব, যোগ, মাতৃদেবী, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা এবং ভারতীয় সভ্যতার উৎপত্তি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। জন মার্শালের 'প্রোটো-শিব' তত্ত্ব এই সিলকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তোলে। পরবর্তীকালে বহু গবেষক সেই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেছেন, আবার অনেকে সমালোচনা করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে অড্রে ট্রুশকের মন্তব্য এবং তার প্রতিক্রিয়ায় অতীশ ত্রিপাঠির বক্তব্য এই পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। সার্বিক তথ্য-প্রমাণ বিচার করলে বলা যায়, পশুপতি সিলকে শিবের প্রাচীনতম রূপ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায় না। একইসঙ্গে এটাও বলা যায় না যে এর সঙ্গে পরবর্তী ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটি এমন এক প্রতীক যা ভারতীয় উপমহাদেশের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীরে নিহিত কোনো ধর্মীয় ও সামাজিক ধারণার ইঙ্গিত বহন করে। সুতরাং একজন গবেষকের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অবস্থান হলো সতর্কতা ও উন্মুক্ততা। পশুপতি সিলকে না অন্ধভাবে 'আদি শিব' বলে ঘোষণা করা উচিত, না আবার সম্ভাব্য সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার সমস্ত সূত্রকে একেবারে অস্বীকার করা উচিত। ইতিহাসের কাজ হলো প্রমাণকে অনুসরণ করা, মতাদর্শকে নয়। আর সেই কারণেই পশুপতি সিল আজও আমাদের সামনে এক অনির্বচনীয় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—যা ভবিষ্যতের গবেষকদের আরও অনুসন্ধানের আহ্বান জানায়।
গ্ৰন্থ সহায়তা:
অড্রে ট্রুশকে, ইন্ডিয়া, ৫০০০ ইয়ার্স অব হিস্ট্রি অন দ্যা সাবকনটিনেন্ট, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, প্রিন্সটন, ইউ এস এ, ২০২৫ ।
লেখক পরিচিতি:
প্রফেসর (ড.) গৌতম মুখোপাধ্যায়,
অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ,
সিধো-কানহো-বিরশা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া।
31/05/2026
12/02/2026