28/11/2024
Written by asif ikbal
আমি চট্টগ্রামের সেইন্ট প্লাসিডস স্কুলে পড়েছি ক্লাস সেভেন পর্যন্ত। জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, নির্ধারিত বক্তৃতা আর আবৃত্তি তে জেলা আর বিভাগ পর্যায়ে প্রথম হবার সুবাদে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের তখনকার প্রধান শিক্ষক মরহুম আ.ন.ম. আবদুল হাই স্যার জোর করে আম্মাকে ইনফ্লুয়েন্স করে আমাকে কলেজিয়েট স্কুলে বছরের মাঝপথে নিয়ে আসেন। কলেজিয়েটে আমার বড় ভাইয়া সদরুল পাশাও পড়েছেন এবং স্যুটিং এ কমনওয়েলথ শিরোপা জিতেছিলেন। সে গল্প অন্য আরেকদিনের। আজ বলবো আমার এক বন্ধুর কথা।
আমি যেদিন সেইন্ট প্লাসিডস ছেড়ে কলেজিয়েটে প্রথম সেভেন বি'তে ক্লাস শুরু করি তখন আমি বন্ধুহীন। চেনা পৃথিবী ছেড়ে পুরো অচেনা এক পরিবেশে। এখানে ক্লাস শুরু হয় দশটায়, শেষ হয় পাঁচটায়। প্লাসিডসে শুরু হতো সকাল ৮.৩০ এ আর শেষ দুপুর ১ টায়। প্লাসিডস মিশনারী ধাঁচের স্কুল বলে ইংরেজির চল বেশ আর কলেজিয়েটে আঞ্চলিক বাংলাই মুখ্য। মনে পড়ে আমার কলেজিয়েটের ডে শিফটের ভর্তির প্রথম দিন ছিলো শুক্রবার। তখন রোববার ছুটি ছিলো। কলেজিয়েটে শুক্রবারের টিফিন ব্রেক হতো সকাল ১১.৩০ মিনিটে, নামাজের জন্য। আর খেলা পাগল ছেলেরা নামাজ বাদ দিয়ে নেমে পড়তো ফুটবল আর ক্রিকেট খেলায়। আমিও তাই করেছিলাম প্রথম দিন। খেলতে খেলতেই আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায় শিবলী, রাফাত, সোমেন, ইকবাল, আনিস, রনি, নাসির, মঞ্জুর, জুয়েল, শেখ আনিস, অভিজিত, কামরুল, সরোয়ার, মোর্শেদুল, শাহীন, মাসুদ, আকন্দ, খসরু, অনিমেষ, সৌমেন, দেবু, তাপস, পলাশ সহ আরও অনেকের সাথে। নামাজ না পড়ে খেলার অপরাধে লাল বিস্কুটের ক্লাসে সেদিন আমার সাথে কি হয়েছিলো সেটা অনেকের মনে না থাকলেও পাশে বসে থাকা বন্ধু আশিক ইমরানের অথবা খসরুর ভোলার কথা নয়।
কলেজিয়েটের বন্ধুদের মধ্যে খসরু আর শাহীন ছিলো দু'ভাই। শাহীন ছিলো দল কাপানো, উড়নচণ্ডী, দূরন্ত, হাসিখুশি আর খসরু শান্তশিষ্ট, পড়ুয়া, মিশুক। সত্যি বলতে স্কুল জীবনে দু' ভাইয়ের মধ্যে খসরুর চেয়ে শাহীনের সাথে আমার সখ্যতা ছিলো বেশী। কিন্তু কলেজ জীবন থেকেই ব্যাপারটা পালটে গেলো। খসরু আর আমি চট্টগ্রাম কলেজে সুযোগ পেলাম। আমাদের ক্লাসের সেকশনও হলো 'বি'। কলেজ জীবনের হাজারো দুষ্টুমিতে আমরা আরও কাছে আসলাম। চট্টগ্রাম কলেজে এমনিতেই স্কুলের বন্ধুদের একটা আলাদা বোঝাপড়া তো থাকেই। আমার সেইন্ট প্লাসিডস আর কলেজিয়েটের সবার সাথেই বন্ধুত্ব ছিলো। কিন্তু অবাক ব্যাপার, খসরুর প্লাসিডসের বন্ধু বেশী ছাড়া কম ছিলো না! এরপর আমরা দুজনই বিকম পড়লাম একসাথে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে একই সেকশনে। তারপর আবার আমাদের দেখা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে (ইন্সটিটিউট অফ বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন)। এখানেই আমাদের বোঝাপড়াটা অন্যমাত্রা পায়। আমরা আবার সেই একই সেকশনে (বি, জীবনে খুব কমই এ সেকশনে পড়েছি)। দুজনই হোস্টেলে একই তলায় কাছাকাছি থাকতাম। আমাদের সব আনন্দ, উল্লাস, উৎকন্ঠা, যন্ত্রণা, বেদনা আমরা ভাগাভাগি করেছি। বিশেষ করে যখন আমার মা মারা যায় তখন সব বন্ধুদের নিয়ে খসরুর পাশে এসে দাঁড়ানো এবং আমাকে গ্যাপ পড়ে যাওয়া পড়াশোনায় সাহায্য করা - এগুলো খুব স্পর্শ করেছিলো আমাকে তখন। নব্বই এর উত্তাল আন্দোলনের সময় আলিমুল্লাহ মিয়া স্যারের মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট পরীক্ষা পেছানোর সংগ্রাম, রাহী স্যারের মার্কেটিং কমিউনিকেশন ক্লাসের তারছেড়া এসাইনমেন্ট ডিকোডিং, কম্পিউটার ম্যানেজম্যান্ট ক্লাসের স্ট্রাগলে উপায়ন্তর না দেখে ইমরান স্যারের কাছে ক্লাস শিফট করা, পরীক্ষার আগে একসাথে চ্যাপ্টার রিভিউ, হোস্টেলের অন্য প্রান্তে গ্রীন সুপার মার্কেটের আলাউদ্দিন সুইটমিটে রাতের জ্বীন হয়ে মিস্টি খেতে যাওয়া, সাজিদের গাড়িতে করে রাতের জ্যোছনা দেখতে যাওয়ার পাগলাটে গল্প, গভীর রাতে আইবিএ হোস্টেলের ছাদ বারান্দায় নিলয় দার গান, এরকম কতো কিছুই না আমরা করেছি একসাথে। এরপর আমাদের পেশাদার জীবনে আমরা দুজন দুপথে গিয়েছি ঠিকই, কিন্তু হৃদ্যতা আর বোঝাপড়াটা অটুটই রয়ে গেছে।
আজ খসরুর জন্মদিন। শুভ জন্মদিন দোস্ত। জীবন কাটুক সুস্বাস্থ্যে, আনন্দে, সাফল্যে, শান্তিতে। লাভ এন্ড হাগ দোস্ত।