13/05/2024
র্যাংলার কিরণ চন্দ্র দে
--------------------------------------
উনিশ শতকের ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কিরণ চন্দ্র দে। জন্মেছিলেন
গফরগাঁয়ের রসুলপুর গ্রামে ১৮৯২ খ্রিস্টব্দে।
পিতা পার্বতী চরণ দে ছিলেন শিক্ষানুরাগী। ময়মনসিংহ জেলা বারের আইনজীবী ছিলেন। নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরই তিনি পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন জেলা শহর ময়মনসিংহে। তখনকার নামজাদা প্রতিষ্ঠান মৃত্যুঞ্জয় হাই স্কুলে ভর্তি করে দেন কিশোর কিরণ চন্দ্রকে। মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে শিক্ষকদের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন মেধাবী ছাত্র কিরণ চন্দ্র। বিশেষত ইংরেজি ও অংকের শিক্ষক বিশেষ যত্ন নিতেন কিরণ চন্দ্রের। ফলে মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স পাশ করলেন। কিরণ চন্দ্র দে যখন মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেছিলেন তখন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বি এ পাশ করে গফরগাঁয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হন কিরণ চন্দ্রের প্রতিবেশী কদম রসুলপুর গ্রামের আফাজ উদ্দিন। সেই ধারাবাহিকতায় কিরণ চন্দ্র দে কে এন্ট্রান্স পাশের পর পাঠিয়ে দেয়া হলো কলকাতায়। তাকেও ভর্তি করা হলো সেই বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে; যেখান থেকে কিশোরগঞ্জের ইটনার আনন্দমোহন বসুর মতো অনেক নামজাদা বাঙালি পড়াশুনা করেছেন। কিরণ চন্দ্র দে কৃতিত্বের সাথে আইএসসি পাশ করেন। মেধাবী এই পুত্রকে নিয়ে পিতা পার্বতী চরণের স্বপ্ন ছিলো অনেক। তিনি প্রেসিডেন্সি থেকে পুত্রের গ্র্যাজুয়েশন করাবেন না। তিনি পুত্রকে ঠেলে দিলেন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায়। জাহাজে চরে কয়েক সপ্তাহ পরে কিরণ দে পৌছলেন সেকালের বিলাতে। পিতার পছন্দের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হলেন। গ্র্যাজুয়েশনের জন্য বেছে নিলেন প্রিয় বিষয় গণিত। ক্যামব্রিজের ম্যাথম্যাটিকস্ ডিপার্টমেন্ট তখন ভারতীয় মেধাবীদের জন্য আলোচিত। দুই দশকের মধ্যে দুই ভারতীয় বাঙালি আনন্দমোহন বসু আগেই এবং গোবিন্দগুপ্ত ক্যামব্রিজে আলোরণ তুলেছিলেন। কিছুদিনোর মধ্যেই দৃষ্টি কেড়ে নিলেন আরেক ভারতীয় বাঙালি কিরণ দে। প্রথমশ্রেণিতে প্রথম হয়ে তিনিও ক্যামব্রিজে ভারতীয়দের সাফল্যেরঐতিহ্যের ধারা আরো মজবুত করলেন। ক্যামব্রিজে কিরণ দের সহপাঠী ছিলেন আসামের গোয়ালপাড়ার জমিদার নন্দন প্রথমেশ বড়ুয়া। সহপাঠীকে নিয়ে বিলাত থেকে জাহাজে করে কলকাতা বন্দরে এসে নামলেন তিনি। সেখানে আসামের রাজপরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করছিলেন। সেখানেই সহপাঠী প্রথমেষের বন্ধুর
পরিবারের সাথে পরিচয় হলো। পরিচয় সহপাঠী প্রথমেষের বোনটির সাথে। খানিকটা সখ্যতা তারপর দুই পারিবারিক পছন্দের ভিত্ততে রাজকীয় আয়োজনে বিয়ে। রাজকন্যাটি ছিলেন নিরহংকার ও মিশুক প্রকৃতির নারী। রসুলপুরের মানুষের কৌতুহল ছাড়িয়ে সেটি সুনাম হিসেবে ঠায় পেলো। এরি মধ্যে গণিত বিশারদ কিরণ দে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিভাগে যোগদিলেন। বিয়ের রাজকীয় আয়োজনের ধুমধাম তখনো জনমনে সজীব। এমন সময় কিরণ দের পরিবারে ঘটে গেল নিদারুন শোকের ঘটনা। প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রাণ হারালেন প্রিয়তম পত্নী। সে শোক আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি এই শিক্ষাবিদ। প্রেসিডেন্সি কলেজের চাকুরী ছেড়ে দিলেন। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বাঙলাভাগ ঠেকাতে পারেননি বাঙালি ও ভারতীয় রাজনীতিকেরা। মুসলিম লীগ সরকারের ক্ষমতার মোহের কাছে বলি হলো হাজার মানুষ। ১৯৫৯- এর দিকে দেশ ছেড়ে গেলেন কিরণ দের দু ভাই। অগ্রজ ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজেন লাল দে, অনুজ চলচিত্রকার নির্মল চন্দ্র দে কলকাতায় চলে গেলেন। কিরণ দে দেশ ছাড়তে কোনভাবেই রাজি হলেন না। স্ত্রীর স্মৃতি আকড়ে ধরে এদেশেই থেকে গেলেন কিরণ দে। অকাল প্রয়াত প্রিয়তম পত্নীর শোকে কেঁদে কেঁদে চোখ অন্ধ করে ফেললেন। ময়মনসিংহ শহরের স্টেশন রোডের বাসায় স্ত্রীর অলংকার সামনে টেবিলে রেখে বসে থাকতেন। এর মধ্যে প্রিয়জনদের অনুরোধে র্্যাংলার কিরণ দে আনন্দ মোহন কলেজের গণিত বিভাগে কিছুদিন কাজ করেন। কিরণ দে মুখে বলে যেতো একজন শিক্ষার্থী তা শুনে বোর্ডে অংক লিখে দিতো। এভাবে বেশ কিছুদিন কাজ করেন। ব্যক্তিজীবনে বিপর্যস্ত মানুষটি ১৯৬৭ সালে মৃত্যু বরণ করেন।
01/11/2023
05/11/2022
05/11/2022