08/06/2026
মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল "তা'আফফুফ"। গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি আন্ডাররেটেড। মানুষ এটা নিয়ে বলে না, অর্জনে চেষ্টা করে না। 'তা'আফফুফ'-এর সঠিক মূল্যায়ন মানুষ করতে ব্যর্থ হয়।
তা'আফফুফ (التَّعَفُّف) কী আসলে?
আত্মমর্যাদাবোধ ধরে রাখা, পবিত্রতা রক্ষা করা, লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এবং চরম অভাব বা সংকটেও অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে বিরত থাকা।
কুরআনের ভাষায়: অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে ধনী মনে করে। তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের কাছে অনুনয়-বিনয় করে সজোরে ভিক্ষা চায় না।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৩)
মুমিনরা এমন হবেন যে, চরম অভাবে থাকা সত্ত্বেও কেবল তাদের ‘তা’আফফুফ’ বা আত্মমর্যাদাবোধের কারণে নিজেদের কষ্ট লুকিয়ে রাখবে। ওপর ওপর দেখলে মনে হয় তারা খুব সচ্ছল, কিন্তু ভেতরে তারা তীব্র সংকটে থাকবে।
তারা কানা'আত ও তাওয়াক্কুলের আমলে থাকবে। কানা'আত হল, আল্লাহ যা দিয়েছেন তার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং অন্যের সম্পদের প্রতি লোভাতুর দৃষ্টি না দেওয়া।
তাওয়াক্কুল হল, সাময়িক অভাব-অনটনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মনে করে ধৈর্য ধারণ করা এবং কেবল আল্লাহর কাছেই নিজের অভাবের কথা তুলে ধরা। মূসা আ.-এর মতো আরজি পেশ করে বলবে, "হে রব, কল্যাণকর যা নাজিল করবেন তা গ্রহণে আমি মুখিয়ে আছি (আপনার দরবারেই আমি ফকীর)।"
তা'আফফুফ ব্যক্তিত্বের সুরক্ষা প্রদান করে। ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্যের কাছে হাত পাতা মানুষের মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দেয়—কিন্তু তা’আফফুফ মানুষকে ব্যক্তিত্ববান হতে শেখায়।
চুরি, ডাকাতি সহ নানান অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে তা'আফফুফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন মানুষের অন্তরে তা’আফফুফ বা আত্মসংযম চলে আসে, তখন সমাজ থেকে চুরি, ছিনতাই, দুর্নীতি এবং চারিত্রিক অবক্ষয় প্রায় একেবারে শেষ হয়ে যায়।
আপনি যদি দ্বীনের ঝান্ডাধারী লিডার হতে চান তাহলে অবশ্যই এই তা'আফফুফ গুণের অধিকারী হতে হবে। অন্যথায় আপনার নেতৃত্বের কোনো আবেদন থাকবে না। নেতৃত্বের বীজটাই হবে মৃত। এখান থেকে কিছুই ফলবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সবসময় আল্লাহর কাছে এই গুণের জন্য দুআ করতেন: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুক্বা ওয়াল 'আফাফা ওয়াল গিনা" (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং পরমুখাপেক্ষীহীনতা বা ধনীতা কামনা করছি)।
সুতরাং, তা’আফফুফ হলো এমন এক অনন্য ঈমানী গুণ, যা একজন মানুষকে মানুষের সামনে ছোট হতে দেয় না এবং আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত সম্মানিত করে তোলে।
মুহতারাম Nazrul Islam হাফিজাহুল্লাহ
18/05/2026
একবার আল্লাহর রাসূল ﷺ সাহাবীদের মোবারক মজমায় বললেন,
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল তার সৃষ্টির মধ্য থেকে এমন কিছু মানুষকে ভালোবাসেন যারা নিষ্কলুষ (অনিন্দ্যচরিত্র), লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা (খ্যাতিহীন), এবং নিষ্পাপ। তাদের চুল উসকোখুসকো, মুখমণ্ডল ধূলিমলিন এবং পেট (ক্ষুধায়) পিঠের সাথে লেগে থাকে।
তারা কোনো আমিরের (শাসকের) দরবারে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাঁদেরকে অনুমতি দেওয়া হয় না। তারা কোনো ধনী বা সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলে বিয়ে দেওয়া হয় না।
তারা অনুপস্থিত থাকলে কেউ তাদের খোঁজে না। তারা কোথাও উপস্থিত হলে কেউ তাদেরকে দেখে আনন্দিত বা উল্লসিত হয় না। তারা অসুস্থ হলে কেউ তাদের দেখতে যায় না এবং তারা মারা গেলে কেউ তাদের জানাজায় উপস্থিত হয় না।"
রাসূল ﷺ-এর মুখে এই বিবরণ শুনে সাহাবীরা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আপনার বর্ণিত গুণে গুণান্বিত কোনো একজন ব্যক্তির উদাহরণ কি আমাদেরকে দেবেন?"
রাসূল ﷺ বললেন, "সে হলো উওয়াইস আল-কারনি।"
সাহাবীরা আবার জিজ্ঞেস করলেন: "উওয়াইস আল-কারনি কে?"
এবার রাসূল ﷺ তার শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইন-ডিটেইলস বলতে লাগলেন। তিনি শুরু করলেন এভাবে:
(গঠনগত বৈশিষ্ট্য)
সে নীলচে বা হালকা রঙের চোখবিশিষ্ট (أشهل), দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত (চওড়া কাঁধ), মাঝারি গড়নের উচ্চতা, গায়ের রঙ তামাটে (খুব গাঢ় পক্ব), এবং তার থুতনিটি বুকের সাথে লেগে থাকে (সবসময় বিনম্রভাবে মাথা নিচু করে রাখে)।
(এবাদতের অবস্থা)
তার দৃষ্টি থাকে সবসময় সেজদার জায়গার দিকে। সে তার ডান হাতকে বাম হাতে লাগিয়ে বুকের ওপর বেঁধে রাখে (নামাজের ভঙ্গিতে)। সে সর্বদা কুরআন তিলাওয়াত করে এবং নিজের অবস্থার জন্য আল্লাহর দরবারে কান্না করে।
(পোশাক ও সামাজিক অবস্থা)
তার পরনে থাকে দুটি সাধারণ পশমি চাদর (একটি লুঙ্গি ও একটি চাদর)। দুনিয়ার মানুষ তাকে কোনো পাত্তাই দেয় না। সে জমিনে অপরিচিত-অখ্যাত, কিন্তু আকাশে (ফেরেশতাদের মাঝে) অত্যন্ত সুপরিচিত।"
(কসমের মর্যাদা)
সে যদি কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম খায়, আল্লাহ অবশ্যই তার কসম পূরণ করেন (অর্থাৎ, আল্লাহ তার দোয়া ফিরিয়ে দেন না)।
(অলৌকিক চিহ্ন)
শোনো! তার বাম পাঁজরের নিচে একটি উজ্জ্বল সাদা দাগ রয়েছে (যা কোনো কুষ্ঠরোগের দাগ নয়, বরং আল্লাহর কুদরতি চিহ্ন)।
(কিয়ামতের মাঠে সুপারিশ)
সাবধান! কিয়ামতের দিন সাধারণ বান্দাদের বলা হবে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো। আর উওয়াইসকে বলা হবে, 'তুমি থামো এবং মানুষের জন্য সুপারিশ (শাফায়াত) করো।' তখন আল্লাহ তাআলা উওয়াইসের সুপারিশে 'রাবিয়া' এবং 'মুদার' (আরবের দুটি বিশাল বড় গোত্র) গোত্রের সমপরিমাণ মানুষকে ক্ষমার মাধ্যমে জান্নাত দান করবেন।"
এবার আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর দুই প্রধান সাহাবিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "হে ওমর এবং হে আলী! তোমাদের সাথে যদি কখনো তার (উওয়াইসের) সাক্ষাৎ হয়, তবে তোমরা তাকে অনুরোধ করবে সে যেন তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করে। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন।"
রাসূল ﷺ -এর ওফাতের পর ওমর রা. ও আলী রা. দীর্ঘ ১০ বছর ধরে উওয়াইসকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন—কিন্তু পাচ্ছিলেন না। অবশেষে ওমর রা.-এর জীবনের শেষ বছরে, যখন তিনি হজের আমির ছিলেন, তখন তিনি মক্কার 'আবু কুবাইস' পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করলেন এবং সমবেত হাজিদের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বললেন,
"হে ইয়েমেনের হাজিরা! আপনাদের মধ্যে কি উওয়াইস নামে কেউ আছেন?"
তখন হাজিদের মধ্য থেকে এক দীর্ঘ দাড়িওয়ালা বয়োবৃদ্ধ শেখ (মুরব্বি) দাঁড়িয়ে বললেন: "আমরা আসলে জানি না কে এই উওয়াইস। তবে আমার এক ভাতিজা আছে যাকে উওয়াইস বলা হয়। কিন্তু সে অত্যন্ত সাধারণ ও অখ্যাত, তার সম্পদ বলতেও তেমন কিছু নেই এবং মানুষের কাছে তার এমন কোনো মূল্যই নেই। সে তো এখন আমাদের উট চরাতে গেছে এবং সে আমাদের মাঝে অত্যন্ত তুচ্ছ ও নীচু প্রকৃতির।"
এই বর্ণনা পেয়ে ওমর ও আলী রা. সেই চারণভূমিতে গিয়ে উওয়াইসকে খুঁজে পান এবং রাসুল সা.-এর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর কাছ থেকে দু'আ নেন। খলীফা ওমর রা. তাঁকে কিছু হাদিয়া দিতে চাইলে তিনি বললেন, "এখনো আমার কাছে চার দিরহাম আছে। গায়ে কাপড় আছে। বায়তুল মালের সাহায্য আমার প্রয়োজন নেই।"
খায়রুল তাবি'ঈন উওয়াইস আল কারনি রাহি.-এর এই ঘটনা থেকে অনেক অন্তর্নিহিত শিক্ষা বের করা সম্ভব। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটো হল:
উওয়াইস আল কারনির যুহুদ এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত উমর ও আলীর (রাদিআল্লাহু আনহুমা) মতো সাহাবীদের টানা ১০ বছর একজন তাবি'ঈর সাক্ষাৎ পেতে খোঁজাখুঁজি করা। আল্লাহর কাছে প্রিয় হতে সার্টিফাইড প্রিয়দের কতো প্রচেষ্টা ও আয়োজন ছিল! ক্ষমা পাওয়ার কী তীব্র আকাঙ্খা ছিল! সেই তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায়? এই প্রশ্নটা নিজে নিজেকে করে টেবিলে মাথাটা ঝুঁকিয়ে যাতে আমরা উত্তর মেলানোর চেষ্টা করতে পারি তজ্জন্য এই পোস্ট। আত্মসমালোচনা ও আত্মোপলব্ধি না থাকলে আমাদেরকে ক্ষতি থেকে কেউ ফেরাতে পারবে না। থামুন, ভাবুন, নতুন করে চলুন।
নোট: সাহাবীদের তুলনা পরবর্তী কারোর সাথে হয় না। ভুলভাবে গ্রহণ না করি। সাহাবী সাহাবীই—অতুলনীয় এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।
Nazrul Islam হাফিজাহুল্লাহ
15/05/2026
স্বপ্নাতুর ঈদ সন্ধ্যা ও অভিভাবক সম্মেলনের নিমন্ত্রণ
বিসমিহি তায়ালা
শরতের মেঘমুক্ত আকাশে যখন ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আজহার আগাম বার্তা ধ্বনিত হচ্ছে, ঠিক তখনই মাতলাউল উলূম মালীগ্রাম মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে বসতে যাচ্ছে সুর ও সুধীজনদের এক অনন্য মিলনমেলা।
আগামী ২৫ মে, রোজ সোমবার, আমাদের মাদ্রাসার আঙিনায় নামবে এক মায়াবী সুরের ঝর্ণাধারা। মুখরিত হবে আমাদের প্রিয় শিক্ষার্থীদের সুনিপুণ প্রতিভা, অন্যদিকে বিজ্ঞ অভিভাবকদের পদচারণায় ধন্য হবে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এই উদ্যান।
আয়োজনের মূল আকর্ষণ:
হৃদয় জুড়ানো ঈদ সন্ধ্যা: যেখানে সুরের মূর্ছনায় অনুরণিত হবে তৌহিদী চেতনার গীতমালা।
অভিভাবক সম্মেলন: আগামীর পথচলাকে সুসংহত করতে আপনাদের মূল্যবান পরামর্শের মিলনমেলা।
মেধার লড়াই: সরফ নাহুর কুইজ, ক্বিরাত, প্রবন্ধ, হস্তলিপি ও বক্তব্যের জমজমাট প্রতিযোগিতা।
পুরস্কারের ডালি: বিজয়ীদের জন্য থাকছে চমৎকার সব উপহার ও সম্মাননা।
ত্যাগের মহিমায় নিজেকে রাঙাতে এবং ইলমের এই বাগিচায় একটি আনন্দঘন সন্ধ্যা কাটাতে আপনি আমন্ত্রিত। আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আমাদের এই আয়োজনকে পূর্ণতা দান করবে।
"এসো মাতি আনন্দের কলতানে, ত্যাগের অমিয় সুধা পানে।"
স্থান: মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ, মালীগ্রাম।
সময়: ২৫ মে, সোমবার।
বিনীত,
কর্তৃপক্ষ, মাতলাউল উলূম মালীগ্রাম মাদ্রাসা।
পোস্টার কারিগর A M Oliullah Marjan
01/05/2026
দাউদ আ. ক্ষমতায় থাকাকালীন ছদ্মবেশে প্রজাদের মধ্যে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি মানুষের কাছে জানতে চাইতেন, "তোমাদের রাজা দাউদ কেমন মানুষ?" সবাই তাঁর প্রশংসা করত।
একদিন ঘটল বিপত্তি। ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে এসে তাঁকে বললেন, "দাউদ খুব ভালো মানুষ—কিন্তু তার একটা সমস্যা হল, সে নিজের ও পরিবারের জীবিকার জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারের (বায়তুল মাল) ওপর নির্ভরশীল।"
এই কথা শোনার পর দাউদ (আ.) আল্লাহর কাছে এমন একটি পথ চেয়েছিলেন, যেন কোষাগার থেকে অর্থ না নিয়ে তিনি নিজের উপার্জনে চলতে পারেন।
আল্লাহ তাঁর নবীর দুয়া কবুল করলেন। তাঁকে দিলেন বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান। তিনি বর্ম বা যুদ্ধের পোশাকে বিপ্লবী পরিবর্তন আনলেন। বর্ম তৈরিতে যে ডিজাইন ও ম্যাটারিয়াল ব্যবহার শুরু করলেন তা ছিল তৎকালীন যুগের মানুষের কাছে অভিনব ও বিস্ময়ের।
দাউদ (আ.) সর্বপ্রথম লোহার চিকন তার তৈরি করে তা দিয়ে শিকল বা রিং-এর মতো গেঁথে বর্ম তৈরি করেন। ইতিহাসে তাঁর সৃষ্টি Chainmail হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই বর্মগুলো ছিল ওজনে হালকা এবং নমনীয়—যেন চিকন তারের লোহার ফ্লেক্সিবল পোশাক। শরীরের সাথে এটি ভাঁজ হতো, ফলে যুদ্ধের ময়দানে দ্রুত নড়াচড়া করা এবং তলোয়ার চালানো সহজ হতো।
দাউদ আ.-এর এই আবিষ্কারের আগে লোহার মোটা পাত দিয়ে যুদ্ধের পোশাক বানানো হতো, যা ছিল অনেক ভারী এবং পরিধান করে যুদ্ধ করা বা নড়াচড়া করা কঠিন ছিল। ভাঁজ তো হতোই না। অত্যধিক ভারি এবং অনমনীয় থাকার ফলে এই পোশাকই যোদ্ধাদের শক্তি ক্ষয় করত। দাউদ আ. নতুন ডিজাইন ও অভিনব বুননে সেই বর্মে আনেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
ইঞ্জিনিয়ারিং এই জ্ঞান আল্লাহ তাঁর নবীকে দান করেছিলেন। সূরা সাবার ১০-১১ নাম্বার আয়াতে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। খুলে খুলে বর্ণনা করার সময় হবে না৷ নিবিষ্ট মনে পড়ার অনুরোধ করে সংক্ষিপ্তভাবে পোস্ট শেষ করে দিচ্ছি।
সাধারণত লোহাকে আগুনে পুড়িয়ে নরম বানিয়ে হাতুড়িপেটা করে ভিন্ন আকৃতি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে দাউদ আ. ছিলেন একেবারে ব্যতিক্রম। তিনি লোহাকে তাপ ছাড়াই খালি হাতে যেকোনো আকৃতি দিতে পারতেন। আল্লাহ তাঁর জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছিলেন (وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ)।
কীভাবে বর্ম তৈরি করবেন তাও আল্লাহ শিখিয়ে দিয়েছিলেন। কুরআনে "سَابِغَات" (সাবিগাত) শব্দ ব্যবহার হয়েছে, যার অর্থ পূর্ণাঙ্গ ও ঢিলেঢালা বর্ম যা সারা শরীর ঢেকে রাখে। এই শব্দের পরপরই বলেছেন, "وقدر في السرد"—অর্থাৎ কড়াগুলো সঠিক মাপে গেঁথে বোনো। হাজার হাজার ছোট ছোট লোহার আংটা বা কড়া একটির সাথে আরেকটি পরস্পর গেঁথে একটি জালের মতো কাপড় তৈরি করা হতো। ইতিহাসে এটিই হল চেইনমেইল (Chainmail) ধরনের বর্ম।
জানেন কি, প্রায় ৩০০০ বছর আগে নবী দাউদ (আ.) লোহার ছোট ছোট আংটা দিয়ে এমন একটি বর্ম তৈরি করেছিলেন যা আজও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে?
লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে। আসুন স্কিপ করে মূল পয়েন্টে যাই।
এই পোস্টের মূল পয়েন্ট হচ্ছে ব্যক্তিগত সফটস্কিল ও হার্ডস্কিল বাড়িয়ে একটি সফল 'স্টার্টআপ' বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাতে পূর্ণ মনোযোগী হওয়া এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতা অর্জনকে এবাদতের বাইরে কিছু মনে না করা। নিজেকে যোগ্য না করে অন্যের পিছনে ঘুরতে থাকলে সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহ করা কখনোই সম্ভব হবে না।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন:
"কারো জন্য নিজের হাতের উপার্জিত খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার আর নেই। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতের কামাই (পরিশ্রমের মাধ্যমে) খেতেন।" বুখারী: ১৯৬৬
উপর্যুক্ত হাদীসটি সামনে রেখে লম্বা একটা দরস দেওয়া সম্ভব। এই হাদীস দ্বারা আল্লাহর রাসূল ﷺ অনেক বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটো হল, নিজেক কর্মোপযোগী করা এবং দায়িত্ব যত বড়ই হোক, ব্যক্তিগত পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করার পথ তৈরি করা।
বাপের বাহাদুরি, ভাইয়ের জমিদারিতে সম্মান নেই। তাদের কল্যাণে প্রাপ্ত অর্থে আলাদা গৌরব নেই। নিজের হাতে যা কামাই করা যাবে তাতেই রয়েছে চূড়ান্ত সম্মান ও উৎকৃষ্টতা। নিজেকে নিষ্ক্রিয় রেখে অন্যের দান-দাক্ষিণ্যে মজে থাকাকে ইসলাম কখনোই প্রশংসা করে না। এমন জীবিকাকে ইসলাম উত্তমও বলে না।
বড় হুজুর, সেলেব্রিটি শায়খ, তুমুল পরিচিত দা'ঈ হলেই যে আপনি ওয়াজ-মাহফিল-সেমিনারকে উপার্জনের পথ বানাবেন, সেরকম কোনো উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে নেই। আল্লাহর রাসূল ﷺ হযরত দাউদ আ.-এর দৃষ্টান্ত টেনে সেই পথটাও বন্ধ করে দিয়েছেন।
দাউদ (আ.) কেবল একজন নবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক বিশাল সাম্রাজ্যের শক্তিশালী বাদশাহ। সাধারণত একজন শাসকের অভাব থাকে না এবং তার শ্রম দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু দাউদ (আ.) রাজা হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিজের ব্যক্তিগত খরচের জন্য কোনো টাকা নিতেন না। তিনি নিজের হাতের শ্রমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবনধারণ করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, সামাজিক পদমর্যাদা যত বড়ই হোক না কেন, নিজ হাতে কাজ করা সম্মানের।
দাউদ আ. কেবল নিজের ব্যবহারের জন্য বর্ম তৈরি করতেন না। তাঁর তৈরি বর্মগুলো সেকালে সেরা মানের ছিল এবং এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। তিনি সেগুলো বিক্রি করে যে অর্থ পেতেন, তা দিয়ে নিজের পরিবার চালাতেন এবং বাকি অংশ জনকল্যাণে বা অভাবীদের জন্য ব্যয় করতেন।
একজন বাদশাহ হয়েও তিনি "কারিগর" হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। আর আমরা কারিগর হব তো দূর কি বাত, ইলম অর্জনের পর মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজ-মাহফিল, সেমিনার বা লেখালেখি না করে কেউ যদি হালাল কর্মসংস্থানে মনোযোগী হন তখন তাঁর গায়ে "উস্তাদদের নেক নজরের অভাব" ট্যাগ লাগিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। কিছু ব্যতিক্রম মানুষ রয়েছেন। আল্লাহ তাঁদেরকে আরো ব্যতিক্রম করে সম্মানিত করুন।
অনেক কথা বাকি রেখেই চিন্তার টেবিলে পোস্টটা রেখে বিদায় নিলাম।
Nazrul Islam হাফিজাহুল্লাহ
07/04/2026
মাতলাউল উলূম মালীগ্রাম মাদ্রাসার গতরাতের দৃশ্য।
০৬||০৪||২০২৬ সোমবার।
কিতাব বিভাগে আবাসিক পড়ালেখার সিস্টেম নতুন চালু হয়েছে।
শুরুতেই ত্বালাবা ভাইরা যথেষ্ট সাড়া দিচ্ছেন আলহামদুলিল্লাহ।
নতুন সিস্টেমের প্রথম দিন,তা-ও আবার মেঘ বৃষ্টির মৌসুম। তারপরও ত্বালাবা ভাইদের সাড়া দেখে মনটা খুবই আনন্দিত।
আগামী শনিবার থেকে সব জামা'আতের ত্বালাবা ভাইরা বাধ্যতামূলক আবাসিকে পড়ালেখা করতে হবে।
ইনশাআল্লাহ তখনকার দৃশ্য এবং পরিবেশ দেখলে আমাদের অন্তরে আরও প্রশান্তি আসবে।
সবকিছুই সুন্দর হবে ইনশাআল্লাহ, তবে কিছু সময়ের প্রয়োজন।
কথায় আছে, "যেকোন ভালো কাজের সূচনা কঠিন। "
আল্লাহ তা'আলা হজরত মুহতামিম সাহেব সহ সকল আসাতিযা হজরাত'এর মেহনত,প্রচেষ্টা ক্ববুল করুক।
01/04/2026
মাতলাউল উলূম মালীগ্রাম মাদ্রাসার নবনিযুক্ত উস্তাযবৃন্দ।
কিতাব বিভাগে: (আবাসিক)
১/মুফতী নজরুল ইসলাম সাহেব, জৈন্তাপুরী।
২/মুফতী মা'সূম সাহেব, দরবস্তী।
৩/হাফিজ মাওলানা মা'সূম সাহেব, বালিদাড়া।
নূরানী বিভাগে:
১/মাওলানা ইমামুল হক সাহেব, দলকিরাই।
২/মাওলানা মামূনুর রশীদ সাহেব, মুক্তাপূর।
আমরা আশাবাদী, বর্তমান মুহতামিম হযরত মাওলানা আব্দুস সাত্তার সাহেব হাফিজাহুল্লাহ্ এর তত্বাবধানে এবং আসাতিযায়ে কেরাম'র মেহনত ও পরিশ্রমের বিনিময়ে আমাদের মাদ্রাসার তা'লিমী,তা'মিরী সার্বিক ব্যবস্হাপনার মান দিন-দিন উন্নত হবে ইনশাআল্লাহ।
08/01/2026
আলহামদুলিল্লাহ মাদ্রাসার বার্ষিক জলসার নগদ চাঁদা ৩৫১৩৩৪/-(তিন লক্ষ একান্ন হাজার তিনশত চৌত্রিশ টাকা)
16/09/2025
ইসলামের একটা অর্থই সাধারণ মানুষ জানে। সেটা কী? শান্তি। ইসলামের মূল শব্দের একাধিক অর্থের একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থ যে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ, তা সাধারণ জনগণের অধিকাংশই জানেন না। কেন জানেন না? জানানো হয় না বলে জানেন না। এক্ষেত্রে অনেকেই ইলম গোপন করেন। আল্লাহ এদের যথাযথ হক বুঝিয়ে দিন।
ইসলামের অর্থ শান্তি তুললেও সেই শান্তি কখন পাওয়া যাবে এবং শান্তি অর্জনের শর্ত কী, তা কিন্তু বলা হয় না। শান্তি বলতে বোঝানো হয়—তুমি মুসলিম, শান্ত থাকবে, মার খেলেও মুচকি হাসির সুন্নাহ আদায় করে জালিমকে জড়িয়ে ধরে বলবে, "ভাই, তুমি কি ব্যথা পেয়েছো?" পুরোপুরি ভুল ব্যাখ্যা। এভাবেই চলছে সুশীল হওয়ার প্রতিযোগিতা।
ইসলামে যে শান্তির কথা বলা হয়েছে তা তখনই অর্জিত হবে, যখন আল্লাহর বিধান মেনে যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দেওয়া হবে। শান্তিকে আনুগত্যের দেয়ালে আবদ্ধ করা হয়েছে। যে যত বেশি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করবে সে তত বেশি প্রশান্ত হবে—দুনিয়া ও আখেরাতে। অথচ এই শান্তিকে আম করে দেওয়া হয়েছে।
সূরা লোকমানের ২২ নাম্বার আয়াতে খাঁটি মুসলিম হওয়ার যদুটো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
১. ব্যক্তি নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে দেবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘনের সুযোগ একবিন্দু নেই। মুমিন কখনোই স্বাধীন নয়; আল্লাহর হুকুম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
২. নিজেকে সমর্পণ করার পর সে তা-ই করবে যা আল্লাহ তাকে করতে বলেছেন। নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে।
উপর্যুক্ত দুটো শর্ত পূরণ হলেই সে আল্লাহর রজ্জু বা ইসলামের হাতল শক্ত করে ধরেছে বলে বিবেচিত হবে।
ঠিক এই পয়েন্টে আমরা কেমন মুসলিম, রাজনীতি করতে গিয়ে কী কী বিসর্জন দিচ্ছি, আসলেই আমরা আল্লাহর গোলাম, না কি সিস্টেমের দাস, তা বুঝে আসবে পরিষ্কারভাবে, যদি আল্লাহ আমাদের বিবেক পরিশুদ্ধ রাখেন।
08/09/2025
আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস, হযরত ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. এর রাতে ঘুম ভেঙে গেল। আজব স্বপ্ন দেখলেন। পেয়ারা হাবীব ﷺ তাকে স্বপ্নে এসে বললেন, "উঠ আব্দুল্লাহ! ইরাকে যাও। সেখানে গিয়ে অগ্নিপূজক বেহরাম কে গিয়ে আমার সালাম বলবে। আর বলবে জান্নাতে সে আমার সাথে থাকবে।"
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. এই স্বপ্নের কোন ব্যাখ্যাই দাড় করাতে পারলেন না। আর আকা ﷺ কে স্বপ্নে দেখাও মিথ্যা হতে পারে না। কিন্তু একজন অগ্নিপূজক কিভাবে পেয়ারা নবীজি ﷺ এর সাথে জান্নাতে এক সাথে থাকবে?!
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. ভোর হতেই সালাত আদায় করে রওনা হলেন। গন্তব্য ইরাক। অনেক লম্বা সফর করে ইরাকে পৌঁছুলেন। বেহরামের ঠিকানা খুঁজে বের করলেন।
বেহরাম হলো একজন সনামধন্য ব্যবসায়ী। তার গুনের মধ্যে এটা আকর্ষণীয় যে, সে দান করার ক্ষেত্রে জাতপাত দেখে না। সবাইকে দান করে। তবে কট্টর অগ্নিপূজক।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. বেহরামের ঠিকানায় পৌঁছে তাকে বললেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক। উম্মতের খেদমতে ইলম বিতরণ অধমের দায়িত্ব।
বেহরাম বললো, ওহ-হো! আপনি কী মুসলমানদের ইমাম আবৃদুল্লাহ ইবনু মোবারক? ইমাম সাহেব রাহি. বললেন, হ্যাঁ আমিই। এবার বেহরাম নড়েচড়ে বসলো।
"বলুন মুহতারাম, আমার নিকট কেন এসেছেন? "
ইমাম সাহেব রাহি. বললেন, "দেখ বেহরাম, আমি অনেক লম্বা পথ অতিক্রম করে এসেছি। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পয়গাম নিয়ে। গতরাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম, রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে তাড়া দিয়ে বলছেন; যাও! বেহরামকে গিয়ে সুসংবাদ দাও। তাকে আমার সালাম বলবে। আর বলবে জান্নাতে সে আমার সাথে একসাথে থাকবে। হে বেহরাম! তুমি তো একজন অগ্নিপূজক। তুমি এমন কী আমল করো যে অকল্পনীয় ও সুউচ্চ সম্মানের অধিকারী তুমি হয়ে গেলে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তোমাকে সালাম জানালেন এবং জান্নাতে একসাথে থাকার সুসংবাদ পৌঁছানোর জন্য আমাকে তাগাদা দিলেন!"
বেহরামের চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। বলতে চাচ্ছিল না সেই গোপন আমল কী। তবুও ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. এর কষ্টের দিকে তাকিয়ে বললো, তাহলে শুনুন -
"আমি একরাতে আমার সমস্ত কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে ঘরে ঢুকলাম। শরীর ক্লান্ত। শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঠিক ঐ সময় আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। আমি অনেক বিরক্ত হলাম। এতো রাতে দরজায় কে? আমি হাতে হারিকেন নিয়ে আলোটা বাড়িয়ে দরজা খুললাম। দেখি একজন পর্দানশীন মহিলা দরজার বাহিরে দাড়িয়ে। আমি তাকে বললাম, এতো রাতে কী চাই? মহিলাটি বললেন, বেহরাম! আমি তোমার কাছে সাহায্যের জন্য এসেছি। আমার ঘরে আলো জ্বালানোর তেল নেই। আমাকে অল্প কিছু তেল ধার দিবে? বাচ্চাগুলো না খেয়ে আছে। তাদের আলো জ্বেলে কিছু একটা খাওয়ানোর চেষ্টা করবো।"
"আমি মহিলার কথা শুনে চরম রাগান্বিত হলাম। একে তো এতো রাত, তাও আবার সামান্য তেলের জন্য বিরক্ত করতে এসেছে? আমি তাঁকে বললাম, কী আশ্চর্য! সারা দিন তুমি কোথায় ছিলে? আমার দোকানে গেলেই তো দিনের বেলা তেল পেয়ে যেতে। আর তোমার চারপাশে কী কোন প্রতিবেশী নেই, তাদের কাছ থেকে নিতে পারলে না?
মহিলাটি বললেন, বেহরাম! আমি তো একটু তেলই চেয়েছি। তাতে এতো রাগান্বিত হচ্ছ কেন? বেহরাম! তুমি মুসলমানদের নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নাম শুনেছ?
আমি বললাম, হ্যাঁ! তাঁকে চেনে না দুনিয়াতে কে আছে? তবে আমি তাঁকে মানি না। আমি আগুনের পূজা করি।
মহিলাটি এবার আমাকে এমন কথা বললেন, যা আমার দুনিয়াকে পাল্টে দিল। তিনি বললেন, হে বেহরাম, আমি একজন সাইয়্যেদা। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর আওলাদ। আমার জন্য সদকা, যাকাত হারাম। তুমি একজন সম্ভ্রান্ত দানশীল। তাই তোমার কাছেই এসেছিলাম।
ইমাম সাহেব! এই কথা শোনার পর এতো রাতে আমি তড়িৎ আমার খাদেমদের ডাকলাম। তাদের বললাম, এক্ষুনি এই সম্মানিতা ও তাঁর সন্তানদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করো এবং কাপড়চোপড় যা লাগে নিয়ে আস। আমি অনেকগুলো নগদ পয়সা (দীনার) নিলাম। খাবার ও কাপড়ের সাথে সেগুলো একসাথে করে একটি গাট্টি বানালাম। আমি নিজের মাথায় গাট্টি নিয়ে নিলাম। খাদেমরা জোরাজোরি করছিল, যেন তারা সেগুলো বহন করে নিয়ে যায়। আমি তাদের বাধা দিয়ে বললাম, আগামীকাল এক বছরের খাবারের সমস্ত ব্যবস্থা করে দিবে। আর সম্মানিতাকে বললাম, আপনার ও আপনার পরিবারের সকল দায়িত্ব আজকে থেকে আমার।"
বেহরাম কাঁদছে আর বলছে-
"ইমাম সাহেব! আমি মাথায় বস্তা নিয়ে সম্মানিতার পেছন পেছন গোলামের ন্যায় চলতে শুরু করলাম। এক সময় তাঁর ঘরে পৌঁছুলাম। তাঁর অভুক্ত সন্তানেরা এতো খাবার দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। একটি বাচ্চা ছেলে সম্মানিতাকে বললো, মা, এতো খাবার কোথা থেকে এলো। কে ব্যবস্থা করলো? সম্মানিতা বললেন, বেহরাম তোমাদের জন্য এই একরাম করেছে।
ইমাম সাহেব! বাচ্চাটি বললো, যার জন্য আমরা এতো এতো খাবার খাবো তাকে আগে দোয়া করে নেই মা! বাচ্চাটি বললো, হে বেহরাম! আজকে আপনি আমাদের যেভাবে খুশি করলেন, কাল হাশরে আল্লাহ তাআ'লাও যেন আপনাকে খুশি করেন। আমার নানাজী ﷺ এর সাথে যেন আপনি জান্নাতে একসাথে থাকেন সেজন্য আমি নানাজী ﷺ কে সুপারিশ করবে।"
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. এর চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এবার বেহরাম বললো, হে ইমাম সাহেব! অবশ্যই আপনাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ সত্য নবী। আপনি আমাকে কালেমা পড়িয়ে দিন। আমি মুসলিম হতে চাই।
বেহরাম চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেলেন। সকল মুমিনের যে তামান্না, তাই বেহরামের নসীব হলো। বেহরাম, তাঁর পরিবার ও সকল খাদেম মুসলমান হয়ে গেল।
আমরা দরুদ শরিফ পড়ি। কখনো দরুদ শরিফের উপর আমল করতে দেখেছেন? হ্যাঁ, বেহরাম আমাদের তা দেখিয়ে গেলেন। দরুদ শরিফের উপর এভাবেই আমল করতে হয়। পেয়ারা হাবীব ﷺ ও তাঁর আহলে বাইতের জন্য নিজ জান মাল সবকিছু এভাবেই উৎসর্গ করতে হয়।